বইয়ের প্রচ্ছদ : দুটো ক্ষোভের কথা বলবো

PIN

এক. একজন লেখক একটা বই লিখলেন বা অনুবাদ করলেন, করার পর প্রচ্ছদশিল্পীকে দিয়ে বইয়ের একটা প্রচ্ছদ (কভার) করালেন এবং একাধিক প্রচ্ছদ করলেন। প্রচ্ছদ তৈরির পর লেখক মহোদয় সেই প্রচ্ছদের ছবি ফেসবুকে আপলোড করে পাঠকের কাছে তেলানো ভাষায় আবেদন করলেন— ‘বলুন তো, কোন প্রচ্ছদটা সিলেক্ট করা যায়?’

এ ধরনের তেলানো আবেদন দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।

আপনি লেখক-অনুবাদক হয়ে পুরো একটা বই লিখতে পারলেন একা একা, একটা প্রচ্ছদের জন্য হাজার জনের মতামত নিতে হয় কেন? বই লিখেছেন আপনি, আপনিই না ভালো জানেন বইয়ের সঙ্গে কোন প্রচ্ছদটা মানানসই। পাঠক কি আপনার সঙ্গে বসে বসে বই লিখছে নাকি? সে কীভাবে মতামত দিবে? আর তার মতামত দেয়ার অধিকারই বা কতোটুকু? লেখকের যে রুচি ও ভালোলাগা, তার সঙ্গে হাজারজন পাঠকের রুচি কি মিলবে? পুরোটা বই লিখতে আপনার ভেতরে যে কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে, বইয়ের পুরো চিত্র যেভাবে আপনার মানসপটে অঙ্কিত, পাঠক তার কতোটুকু অনুধাবন করতে পারবে? অধিকাংশ পাঠক জানেই না বইটি কী বিষয়। তাহলে তার মতামত নেয়ার দরকারটা কী?

আর ফেসবুকে সব পাঠকই যে শিল্প বা প্রচ্ছদের ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান রাখে, এমনটা ভাবাও চরম বোকামি। ফেসবুকের ৯০% লোকই শিল্প বা প্রচ্ছদের শিল্পমানের ব্যাপারে অজ্ঞ। তাদের সামনে প্রচ্ছদ চয়েজের অপশন দেয়া মানে শিশুর হাতে পারমাণবিক মিসাইল তুলে দেয়া। একজন বলে নীল, আরেকজন মেজেন্ডা, আরেকজন বলে— হালকার উপর ঝাপসা কিঞ্চিৎ মিষ্টি কালার দেন। কেউ বলে— পাতাটা ত্যাড়ছা দেন, আরেকজনে বলে গম্বুজটা সিধা মারেন, বইয়ের নামটা শুয়ায়া লেখককে খাড়া কইরা দেন!
হোয়াট আ রাবিশ মেন্টালিটি!

ডিজাইনারকে দিয়ে প্রচ্ছদটা ফাইনাল করার পর জাস্ট ঘোষণা দিয়ে দেবেন—এটা বইয়ের প্রচ্ছদ! পাঠক ভালো বললেও এটাই, ভালো না লাগলেও এটাই ফাইনাল। বই পাঠযোগ্য হলে প্রচ্ছদে কিছু যায় আসে না। চেনা ঠাকুরের যেমন পৈতা লাগে না, ‘অগ্নিবীণা’র তেমন প্রচ্ছদ লাগে না।

আর লেখক যদি মনে করেন— প্রচ্ছদের ব্যাপারে তাঁর রুচিবোধ শূন্যের কোঠায়, তাহলে এ দায়িত্বটা পুরোপুরি প্রচ্ছদশিল্পীর ওপর ছেড়ে দেন।

দুই. প্রচ্ছদের জন্য পাঠকের চয়েজ গ্রহণ করা মানে—ডিজাইনারকে অপমান করা। মানে—প্রচ্ছদের ব্যাপারে আপনি প্রচ্ছদশিল্পীর শিল্পীমনকে ভরসা করতে পারছেন না। তার শিল্পীসত্তাকে ছোট করে দেখছেন। আপনি টাকা খরচ করে ডিজাইনারকে দিয়ে প্রচ্ছদ করিয়ে, সেটার পছন্দ-অপছন্দের ভার তুলে দিচ্ছেন আপামর লাইকমারা পাবলিকের হাতে! এটা কি ভদ্রলোকের কাজ?

এটা অনেকটা—বিয়ের জন্য কয়েকটা পাত্রী দেখে ফেসবুকে তাদের ছবি দিয়ে মতামত জানতে চাওয়া—কোনটা বিয়ে করা যায়? ফেসবুক-পাবলিক পাত্রীদের ছবি দেখে, ‘নানা দিক’ বিবেচনা করে তাদের মতামত জানাতে লাগলো। যার ছবির নিচে লাইক-কমেন্ট যতো বেশি—আপনি তাকে বিয়ে করবেন? নাকি বিয়ে-পাত্রী এটা পার্সোনাল বিষয়?

বিয়েটা যদি পার্সেনাল, বইটা কি আপনি পার্সোনালি লিখেন নাই? সেটার জন্য কেন পাবলিক ওপিনিয়নের প্রয়োজন হয়? কেন ডিজাইনারকে অপমান করার জন্য প্রচ্ছদের একাধিক চয়েজ পাবলিকের হাতে তুলে দিচ্ছেন? দুই হাজার টাকা দিয়ে প্রচ্ছদ করালেই অপমানের সার্টিফিকেট কভার ডিজাইনার আপনার হাতে তুলে দেয় নাই।

আপনার যদি এতমিনান না থাকে ডিজাইনারের প্রতি, যাবেন না তাঁর কাছে। অন্য আরেকজনের কাছে যান। পাবলিকলি কারো শিল্পীসত্তাকে ছোট করে নিজের লেখক-অনুবাদক-প্রকাশক সত্তাকে মহান করার চেষ্টা করবেন না!

লিখাটি মূলত শ্রদ্ধেয় সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর সাহেবের।

Leave Your Comments